এই সংখ্যার সম্পাদক : রাণা রায়চৌধুরী
এই সংখ্যাটির
দায়িত্ব মিতুল আমাকে দিয়েছে। আমি রাজি হয়েছিলাম দুটো কারণে– এক, সম্পাদক হওয়ার যোগ্যতা
আমার কতটুকু তা ঝালিয়ে নেওয়া। দুই, যেহেতু মিতুল দত্ত আমারই দশকের একজন এবং নিষ্ঠাভরে
একটা কাগজ করে দীর্ঘদিন ধরে– সঙ্গে অনেক তরুণ কবিরও বই প্রকাশ করে– ফলত, তার এই বাংলা
কবিতাকে নিঃস্বার্থ সেবার কথা মনে রেখেই রাজি হয়ে যাওয়া।
সম্পাদক
হওয়ার যোগ্যতা সবার থাকে না। যেমন আমার অতীতের অভিজ্ঞতা। আমি 'পালক' এই নামে একটা পত্রিকা
করতাম, তাও প্রায় পঁচিশ বছর আগে। পত্রিকা করতাম, মানে 'সম্পাদক' সেজেছিলাম দাড়িগোঁফ
লাগিয়ে। মণীন্দ্রবাবুর কাছে কবিতা চেয়েছিলাম। কবি মণীন্দ্র গুপ্ত দিয়েওছিলেন একটি কবিতা।
কিন্তু হায়! আমি তখন নতুন লিখতে এসেছি। কবিতার পুরো রহস্য, পুরো কুয়াশা আমি তখনও ভেদ
করতে পারিনি। স্বাভাবিকভাবেই মণীন্দ্রবাবুর কবিতাটির ইশারা ও ইঙ্গিত আমি সেই সময়ে বুঝতে
পারিনি। কবিতাটির গোপন রহস্য আমার মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছিল। আমি দাড়িগোঁফে হাত বোলাই
আর ভাবি, যে সম্পাদক কবিতার সব প্রতীক-রূপক-অলংকার-ইশারার মানে বোঝে না, তার কি সম্পাদকের
ভূমিকায় অভিনয় করা উচিত? আমি ভাবি। ভাবতেই থাকি। আমার ভয় করতে থাকে। ভয়ের ঠ্যালায় আমি
পালক-এর দুটো সংখ্যা্ বের করার পর তা বন্ধ করে দিই।
এই যে এখন
এতো কবিতা-পত্রিকা প্রকাশিত হয়– এই যে এতো কবিতা-কাগজের সম্পাদক– এঁরা সকলেই কি যোগ্য?
সারা বাংলাদেশের(পঃবঃ) যত জনসংখ্যা, তার অধিকাংশ জুড়েই কবিতা পত্রিকার সম্পাদক গিজগিজ
করছে। যেদিকেই তাকাবেন দেখবেন বাংলা কবিতার এডিটরের দল পাখা মেলে উড়ছে। আসলে কবি যেমন
সকলেই হন না, কবির ভূমিকায় কিছু বাঙালি অভিনয় করেন মাত্র!(যেমন আমিও হয়তো অভিনয় করছি।)
তেমনই দু-একজন প্রকৃত সম্পাদক! বাকিরা অভিনেতা!
বেশির ভাগ
সম্পাদকই সংকলন তৈরি করেন। কিছু কবিতা নিয়ে ছেপে দেওয়া আর কী! একজন প্র্রকৃত সম্পাদককে(কবিতা
পত্রিকার) সর্বগ্রাসী হতে হয়। বিরাট কল্পনা-প্রতিভা না থাকলে কবিতা-কাগজের সম্পাদক
হওয়া যায় না। তাঁকে সবটা বুঝতে হবে। একজন প্রকৃত সম্পাদক আসলে কবিদের কবি। গল্পকারের
গল্পকার। একটা ভালো পত্রিকা সম্পাদনা করা মানেই একটা ভালো সিনেমা তৈরি করা। সে রকম
ক'জন আছেন আর এখন? 'অলিন্দ'-র প্রণবেন্দু বা 'নির্বেদ' পত্রিকার মানিক চক্রবর্তী বা
'এমাসের কবিতা'-র জমিল সৈয়দ বা 'পুনর্বসু'-র মতো কাগজ বা অনন্য রায়, তুষার চৌধুরীদের
'কবিতাদর্পণ', বা 'যোগসূত্র'-র মতো পত্রিকা বা গৌতম চৌধুরীর 'অভিমান' বা মণীন্দ্র গুপ্ত,
রঞ্জিৎ সিংহদের 'পরমা', শ্যামলকান্তি দাশের 'বররুচি'-র মতো কাগজ?
আসলে ভালো
পত্রিকার সম্পাদনা করা মানেই সাধনার চূড়ান্ত জায়গায় পৌঁছোনো। প্রথম থেকেই একজন স্থপতির
মতো চিন্তা করতে হবে। একজন ভালো সুরকারের মতো সুর দিতে হবে কাগজকে। একজন বড় মাপের শিল্পীর
মতো মনে মনে রং-তুলি-রেখার চর্চা করতে হবে। যেন কাগজটি তাঁর বহু বর্ণে-রঙে-চরিত্রে-মেধায়
চূড়ান্ত ভাস্কর্যের জায়গায় পৌঁছোয়।
কিন্তু
এখনকার পত্রিকাগুলো সেই মানে পৌঁছোয় কি? বিশেষ করে কবিতার কাগজগুলো? আমি তো দীর্ঘ দিন
ও বছর ধরে কবিতার কাগজগুলোতে ঘষে চলেছি। কবি হয়ে ওঠার অভিপ্রায়ে। কবিতার উপাসনা গৃহই
ভেবেছিলাম লিটিল ম্যাগাজিনগুলোকে। এখনও ভাবি তাই। কিন্তু, এখন বহুপথ হাঁটার পর, কেমন
যেন সন্দেহ হয় সম্পাদকদের। এখন বুঝি কেউ কেউ ফাঁকিবাজি করেন। স্রেফ একটা সংকলন! ব্যাস্!
সম্পাদক হিসেবে নাম ফেটে গেল! তারপর সম্পাদকে-সম্পাদকে লেনদেন। তুমি আমায় ছাপো। আমিও
তোমায় ছাপবো।
সত্যি আমাদের
বন্ধু সম্পাদকদের মধ্যে কিছু ব্যতিক্রমী সম্পাদক নিশ্চই আছেন। তাঁদের আমি মনে মনে শ্রদ্ধা
করি। শেখারও আছে অনেক তাঁদের কাছে। কী পরিশ্রমই না-করেন তাঁরা! টাকার কথা ছেড়েই দিলাম।
তাঁদের তরুণ কবির প্রতি নজর, অনুসন্ধান, নতুন কবিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে জায়গা করে দেওয়া–
আমি বিস্মিত হই এঁদের কাজে। সম্ভ্রম জাগে। ভালোবাসা জাগে। শ্রদ্ধা জাগে।
আমি কবিয়াল-এর
এই একটা সংখ্যার সম্পাদক সেজেছি। 'সেজেছি' শব্দের মধ্যে কোনও ব্যঙ্গ বা বিদ্রুপের ইশারা
নেই। মিতুল আমাকে শ্রদ্ধার সঙ্গেই এই চেয়ারে বা টুলে বা সিংহাসনে বসিয়েছে। আমি আপ্রাণ
চেষ্টা করেছি মিতুল দত্তকে সেই সম্মান ফিরিয়ে দিতে বা সম্মান রাখতে।
মূলত– নতুনদেরই
লেখা নিয়েছি বা অপরিচিত মুখের সন্ধান করেছি। যদিও ফেসবুকের দৌলতে এখন সবাই কবি, সবাই
সম্পাদক বা সকলেই লেখক। কিন্তু ইতিহাসে মুড়ি আর মিছরি কোনওকালেই এক হয়নি। আমি তাই প্রকৃত
সাহিত্য-উপাসককে বা কাব্যসাধক-কেই খুঁজেছি। পেরেছি কিনা পাঠক বলবেন। এই সংখ্যার যা
ব্যর্থতা তা কোনও লেখক বা কবির নয়– তা আমারই।
সবাইকে শুভেচ্ছা, নমস্কার, প্রণাম, ভালোবাসা।
রাণা রায়চৌধুরী

এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।
উত্তরমুছুনএত দ্বিধাহীন উচ্চারণ রাণাদাকেই মানায়। কতটা সৎ উচ্চারণ নিয়ে লিখেছ। বহুবার পড়লাম রাণাদা। নিঃসন্দেহে তোমার সেরা কাজের মধ্যে থেকে গেলো। এরকম সম্পাদকীয় পড়িনি আমি।
উত্তরমুছুনখুব জরুরি সম্পাদকীয়। খুব ভালো লাগল।
উত্তরমুছুন