শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৪

বাই দ্য সী-সাইড / রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়


Neither I'm living lies,
Nor I'm dying truth...

অতঃপর আমাদের সমস্ত লেখালেখি একটা গাধার পিঠে তুলে দিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়ি। মৃত প্রাচ্য নক্ষত্রের জীবিত আলো অনুসারী এক্ষণে আমাদের পাথেয় হল হাওয়া ও জল। আমরা কবিতার নামে সমস্ত ভণ্ডামি ত্যাগ করে মুণ্ডিত মস্তক হলাম।
আমরা গৃহ ত্যাগ করলাম।
রাবার গাছের নিচে অনেকক্ষণ বসে থাকলে যে শ্বাসকষ্ট হয়, আমরা তাকে স্বীকার করলাম। ঘাম যেহেতু
আমাদের পরম সুগন্ধি, দর্পণের বিপরীত পিঠ যেহেতু আমাদের চরম বিম্বতল, নেতার হাটে যেহেতু ছদ্মবেশী ধোবি মাত্রই আমরা; সেহেতু সেই একমাত্র বোঝ ও বোঝনদার গাধাকে আমরা আলিঙ্গন করলাম।
আমরা আমাদের সব লেখাই এ যাবৎ মাধবীকে লিখেছি। জেনেছি, মাধবীর মূলক আছে। যার সাথে যোগসূত্র হয় সেই একথা মানে। এরকম অল্প কয়েকজন কখনও একসাথে তারা হয়। তারারাও হারিয়ে পড়ে।
আমি তাই আর মাধবীকে লিখি না এই নাক্ষত্রিক রাত্রিকালেরর কথা। আমাদের কমজোর হৃদপিণ্ড আর অর্ধেক হাওয়া ধারণেও ব্যর্থ ফুসফুসের কথা। আমাদের শিরা ও ধমনীর পারস্পরিক রক্ত চলাচল বিনিময়ের কথা।
মাধবীর ডেস্কে আমাদের তাবৎ পুরনো লেখা জমে থকে।
বালুঘড়ির দিকে তাকিয়ে সেই যে মাধবী বেলাতটে এসে দাঁড়ায়।
গুঁড়ো বালিরা তখন জমাট ও সন্নিবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করে। মাধবী যখন প্রত্যয়ী দাঁড়ায়, তারা আবার মৌলাতিমৌলে ভেঙে যেতে থাকে।
তখন উড্ডীন হাওয়া। আর অধঃগতি যত শোক ব্যাধি জরা।
দৃশ্যত এই সমুদ্রের পরে
ভারী পর্দা টেনে দিই
আগে ও পরে আলো সরে যায়
আমি মাধবীকে অগত্যা ডাকি
এই ৪৫টা গ্রীষ্মের অনন্ত পাখি সে
আধখানা মাধবী আমার বাহির
বাকি আধখানা ঘর
এই ঘর জোড়া আয়না
ওর ভ্রূ আর যা যা কিছু
ভঙ্গ ও ভঙ্গিমা
তার ছায়া ও পরছায়া
দেওয়ালে ভেঙে ভেঙে ওঠে
এই সেই নিদারুণ রাত্রি সাভিনিবেশ। গাধার পেটের ভেতর ঢুঁ মেরে মেরে বের করে আনা, বালুঘড়ি ধরে মিলিয়ে নেওয়া, তারপর মাধবীর মূলকের সাথে হৃদয়যৌগ গড়ে তোলা।
এটা অবশ্য মাধবীরই মনে করে দেওয়া, যে সে নয় তার মূলকমাত্র। আমাদের সাথে সম্পর্ক নবীকরণ সূত্রে এ এক অন্য মাধবী।
এই তো দাঁড়িয়ে আছ
একটা গাছের ছাতা
নিজেই ধরে
দেখে
টুপি উড়িয়ে দিলাম নুন হাওয়ায়
প্রতিপক্ষ
ঝাউ, ঝাউ আর ঝাউ
অশরীরী ইঙ্গিতে
কিছু বলছে
বলছে কী?
শুনছ না
নিজের সাথে
নিজেই একলা হয়ে যাচ্ছ
ক্যালেন্ডারে রাত বাড়ছে
চকমকি পাথর
শধু শব্দ নয়
আলো ঠিকরে দিচ্ছে
ওম
ভারশূন্য হচ্ছি
ঈথারে ভাসছি
অনেক নিচে
জলের পরমান্ন জল
পরমায়ু সাজিয়ে রাখছে
মাধবী সেই বেলাতটে এসে দাঁড়াল। আলো ও হাওয়া ছুঁল তাকে। জল আগেই ছুঁয়েছিল। এই ছুঁল, তাকে যখন তার আর কোনও স্থানিক বা কালিক উপস্থিতি নেই।
চাঁদে আজ হাট বসেছে
তার ছায়া পড়েছে এই জলে
এই ছায়া গুণ টানছে
সকলই নৌকার
একটা দুটো যারাই আজ ধরা পড়েছে
মারমেইড বনে যাচ্ছে
বালির ওপর এই কাঠকুটো
অল্প তাতে নেশা বুনছি
তারা এসে দাঁড়াচ্ছে
সমুদ্রদেবী
জীবনের বরাভয়
মাধবীর কোয়া ঠোঁট। মাধবীর জোড়া ভ্রূ। মাধবীর চ্যাপ্টা নাক। নাকে নাকছাবি। মাধবীর পুরু গোছ। মাধবীর জিব, নাভি আর যোনিতে নথ। যে জানে সে জানে। মাধবীর হাতের আর পায়ের লম্বা ডাগর আঙুল। যেন তন্বী দু জোড়া পেঁপে পাতা সবুজে মেলে দিয়েছে। মাধবী যা পরে তা লাল। বিছানার চাদর হ্যান্ডমেইড কালো হলে লাল পলাশ ফোটে। দাঁতে ফোটে। নখে ফোটে। মাধবীও ফোটায় শিমুল। তখন শিমুলে পলাশে। পলাশে শিমুলে।
ওর এক পায়ে রূপচাঁদা সাপ জড়িয়ে থাকে। কাঁধে পায়ের গোছ উঠলে সেই সাপ জড়িয়ে জড়িয়ে গড়িয়ে নামে। নামতে থাকে।
সবচেয়ে ভাল লাগে শঙ্খ লাগানোর পর ও যখন উঠে যায়। কালো চাদর অনাদরে লুটোয়। ও ধীরে ধীরে জলে নামে। জলে তখন আঁশ বৃত্তে উপবৃত্তে ভাসে। তারা ধীরে ধীরে মাধবীর শরীরে এসে বসে। মাধবী ধীরে ধীরে তাদের শরীরে বসায়।
একটি অমোঘ অধিকার করে বসে আছে
মাধবী, তোমার চিবুকের তিল
তোমার আদুরে বেড়াল
বিভাজিকায় লেজ নাড়ে
যত্রতত্র তোমার পায়ের ছাপ
যত্রতত্র বেড়ালের লোম ওড়ে
একটা অতি ধূসর বেড়ালের
একটা অতিকায় লাল মাধবীর
আমি অতঃপর মাধবীকে নিখুঁত ও নিদারুণ হত্যা করি ও তাকে আরকসিক্ত রাখি। আমি তাকে মমি প্রায় বালিতে শুইয়ে দিই। নিরন্তর, এই একান্ত জল, আলো ও হাওয়ার গন্ধ, বর্ণ ও স্পর্শে সে দেবী হয়।
মাধবী এসে এই তটে নামে
বিসর্জনের আলো ও শব্দে
এই সমুদ্রতীর লেখা হয়
ঘোড়াদের মুখ থেকে পরপার জানা যায়
ওরা ডানা গুটিয়ে রাখে
দেবী ধোবিঘাট ছেড়ে গেলে
ওড়া শুরু
মাধবীকে মাধবী বললাম। বিকেলে ওড়ার ফুল। এই সেই বিকেল সমুদ্র গড়িয়ে আনছে। একা করে দিচ্ছে আরও। আরও আরও।
এই পরপার। এই পারাপার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন