শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৪

চারটি কবিতা / রোহণ ভট্টাচার্য


স্নান

আজ আর চুল খোলার শব্দ নেই। তুমি গান হয়ে বেজে ওঠোনি একবারও। এরকম ক্লান্ত এপ্রিল, শুধু ধুলোর গল্প বলে। মেঝেভর্তি ধুলো, ব্যথাভর্তি ধুলো। ছুটে যাচ্ছে এক দেওয়াল থেকে অন্য দেওয়াল। দমকা হাওয়ায় বইয়ের পাতা উলটে যায় পেছনের দিকে। ইতিহাসের দিকে দৌড়ে যায় ধুলো। ইতিহাসের মলিন পাতা ছটফট করে তক্তাপোষে। যেন কল খুললেই ঝরে পড়বে যাবতীয় জলের ঝগড়ায়। ছেঁড়া নদীর মতো অসুখ। ওষুধের পাতা অসুখ ধরবে বলে ভেসে যাচ্ছে খোলা দরজার কাছে। তবু তুমি বৃষ্টি চাইছ। বারান্দা চাইছে তোমাকে। সেতারে আঙুল বাজাচ্ছেন শিল্পী। যেভাবে আকাশে বেজে উঠবে মেঘ। আর বর্ষাকাল খুলে তুমি ঢুকে পড়বে স্নানঘরে।



টেলিভিশন

আজ সারাদিন নতুন চ্যানেল চলছে। চ্যানেল জুড়ে আংশিক শহর। বহুতলে ঢেকে আছে আবহাওয়ার খবর। কাগজে ঝড়-জলের বিজ্ঞাপন ছিল গতবছর। রামধনু উঠেছিল তোমাদের ছাদ বরাবর। ক্যামেরা হাতে তার সাক্ষাৎকার নিতে বেরিয়েছিল তরুণ সাংবাদিক। আজ এইসব দেখাচ্ছে টিভিতে। বাজারের ব্যাগ হাওয়ায় দোল খেতে খেতে নেমে যাচ্ছে মাটির কাছাকাছি। আবার উঠে আসছে শরীরভর্তি মাসকাবারি সমেত। দেওয়াল বেয়ে প্রতিদিনের এই সাংসারিক ওঠানামা। এই নিয়ে আলোচনা হবে। তবু চ্যানেল পাল্টানো বারণ। যেন পৃষ্ঠা ওল্টালেই নতুন হয়ে যাবে চারপাশ। যেন উন্নয়নশীল আকাশ যানজটহীন রাস্তার চেয়েও সাবলীল হয়ে যাবে। তবু ব্যাগ আবার খালি হয়ে লাট খাবে জানলায়। ব্যর্থ পতাকা হয়ে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলবে বাতাসের সাথে। ক্রিকেট ম্যাচ গড়াবে দুপুরের দিকে। গড়াপেটাহীন দুপুর, মেঘময় দুপুর, উঠোনে দাঁড়াবে বর্ষার পূর্বাভাস নিয়ে। তবু কোথাও লিখবে না আজ আমাদের মনেমনে কথা বলার দিন। কিছুতেই যেন তোমার টেলিফোন বেজে না ওঠে। ওকে শান্ত করো। ওকে হাওয়াবাতাসের দেশ থেকে সান্ত্বনা এনে দাও। তুমি কি সিগারেট ধরালে এইমাত্র? দুই আঙুলে পুড়িয়ে ফেলছ মুহূর্ত। সময় পুড়ে ছাই হয়ে পড়ছে তোমারই পায়ের কাছে। তোমার অন্যমনস্ক রাস্তা টেলিকাস্ট হয়ে গেল এখুনি। অথচ তুমি জানলেও না, আজ নতুন চ্যানেল চলছে। সারাদিন খোলা আছে জানলা।



রাখিপূর্ণিমা

মেঘের সুতো দিয়ে বাঁধা পূর্ণিমার চাঁদ। এই হল রাখি। বাইপাসের ওপর ঝুলে আছে বিপজ্জনকভাবে। নীচে কালো দাগ দিয়ে দুখানা ভাঙা ফুটপাথ আঁকা। যেন উইয়ে কাটা দুটো কবিতার লাইন পাশাপাশি শোয়ানো। মাঝখানের গাড়ির রাস্তা, প্যারাগ্রাফের স্পেস। রাস্তার শেষে কোনও ফিনিশিং লাইন নেই। আগে গিয়ে দড়ি ছুঁয়ে দেওয়ার তাড়া নেই। দড়ি আত্মহত্যাপ্রবণ। ফিনিশিং লাইন গলায় জড়িয়ে ঝুলে পড়েছে একজন। গলির মুখে হৈ-হল্লা, পুলিশের ভ‌্যান। লাশ নামানো হবে। যার হাতে জন্মদাগের মতো সেলাই করা রাখি। সেলাইয়ের দাগ এখনও শুকায়নি। কিছুটা ক্ষত থেকেই যায় শেষপর্যন্ত। চুন-সুরকির জীবন কখনওই খসে পড়বে না সবটুকু। পকেটে মোবাইল বাজছে চিরকালের জন্য। শেষবারের মতো বাজছে সম্পর্কের নাম। গলির বাইরে তখনও কেউ কিছু জানে না। ট্রাফিক পুলিশের ইশারামনস্ক আঙুল চাঁদের দিকে তাক করা।



ভাঙাচোরা ডাইরি

এরকম অনেক কান্না আছে যার গোঙানির শব্দ শোনা যায় না। এই যেমন সাইলেন্ট মোডে রাখা সেলফোনের পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছ।(দুপুর : পাঁচটা তেত্রিশ)

স্ট্র্যাপ ছিঁড়ে গেলে চপ্পল পা থেকে উঠে আসে হাতে। খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে গোটা রাস্তাটাই লিখে ফেলল ছেলেটা। কী আশ্চর্য, জুতো আবিষ্কারের গল্প সে জানতেও চাইছে না।(বিকেল : এগারোটা পঞ্চাশ)

নদীর পাড়ে যাওয়া হল না কোনওদিন। কল খুলে এইসব ভাবছিলে তুমি। হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলে শুকনো নদীপথের মতোই তোমার ভাগ্যরেখা। তার ওপর বিন্দু বিন্দু জল জমেছে এই বছর।(সন্ধে : চারটে কুড়ি)

এইরকম এলোমেলো দিনে নিজেকে বেমানান মনে হয়। বাকিরা তোমার মতো নয় জেনে সবার মতো করে বদলে নাও নিজেকে। চশমা ঠিক করার অজুহাতে মুছে নাও চোখ। মাথার ঘাম পা অবধি নামে না। চিঠিপত্র পৌঁছোয় না ডাকবাক্স অবধি। ব্যাক্তিগত পাখি পৌঁছোয় না আকাশে। এই ঘড়ি তোমার পোষ মানা। অন্য ঘড়ির সাপেক্ষে মিলিয়ে নাও সময়। অবুঝ কাঁটাগুলোকে প্রাণপণ আটকে রাখতে চাও সন্ধের গায়ে...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন