আমরা অর্থাৎ বড়লোকের বাড়ির ছেলেদের একটা নিজস্ব জীবনছন্দ রয়েছে। মেয়েদেরও হয়তো তাই কিন্তু এই গা ছমছম করা গল্পে যে বা একটিমাত্র মেয়ে আসবে সে কেমন ঘরের মেয়ে তা আমরা বুঝতে পারিনি। এমনও হতে পারে যে, সে এই জগতেরই কোনও মেয়ে নয়। শীতকাল হয়তো কুয়াশার সঙ্গে ধোঁয়া ও কুহক মিলমিশ করে এরকম মারাত্মক মেয়েদের বানায়। ভাবলেই আমাদের ভরা শীতেও বিনবিন করে আতঙ্কের ঘাম দেখা দেয় এবং লেপ ও মশারির বাইরে মল্লিকাকার হাসি এন্তার শোনা যায়। আমরা ভয়েতে উপুড় হয়ে পুরানো ফুলেল বালিশে নাক গুঁজে দিই। যে সব ন্যাপথলিনের বল ছোট হতে হতে শেষে নিশ্চিহ্ন মিলিয়ে গেছে তাদের গন্ধই তখন আমাদের ভরসা। শীতের বিকেলে কেক, প্যাস্ট্রি, ক্রিম-রোল, চমচম- এই সবের সঙ্গে গরম দুধ খেয়ে আমাদের গা গুলোত। অল্প অল্প ভুঁড়ি ছিল আমাদের। বাড়ির ঝি-রা বলত, বড়লোকের ব্যাটা, খেয়ে খেয়ে জাগলাপেটা। গা গুলিয়ে ওঠার অন্য কারণও ছিল। গরম দুধ খাওয়ার আগে আমাদের কোট, সোয়েটার, টুপি, উলের মোজা, দস্তানা, উলিকটের গেঞ্জি এইসব পরানো হত। বাড়ি বাড়ি ঘুরে ব্যাডমিন্টন খেলার আগে রোজই এই এক রুটিন। এর পরে ব্যাডমিন্টন র্যাকেট নিয়ে আমরা বেরিয়ে পরতাম। থপ-থপ করে পা ফেলে ফেলে। ফুটপাথে বা রাস্তায় আমাদের এক একটা পা পড়ে আর গালের মাংস কেঁপে কেঁপে ওঠে। সেই সঙ্গে থাকত গা গুলানো ভাব। এইভাবেই আমরা শীতের সন্ধেবেলায় এক একজন বন্ধুর গমগমে কুকুর-ডাকা বাড়িতে গিয়ে পৌঁছতাম। অনেক সময় অন্যদের সঙ্গে আগেই দেখা হয়ে যেত। বড় গেটের সামনে। সকলের বাড়িতেই ছিল বাগান ও লন। শীতকালে সব বাড়িতেই মালিরা ব্যাডমিন্টন-কোর্ট বানাত। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এক একটা বাড়িতে খেলা হত। কখনও কাছে। কখনও দূরে। দূরে হলে আমাদের গাড়ি নিয়ে যেত। আবার নিয়েও আসত। ব্যাডমিন্টন-কোর্টে ঝলমল করত আলো। সেই আলো ঠোঁটে করে ফেদার উড়ে নেটের এপার-ওপার করত। কখনও জালে আটকে ঝুলত। কখনও ঝুলে পড়া ডালে, কখনও আলো-আঁধারি পাতার ফাঁকে গায়েবও হয়ে যেত। আমরা দেখতাম ছেঁড়া শার্টলককের পালক গাছের তলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আজকাল বাজারে মুরগির মাংসের দোকানেও ওরকম দেখা যায়। সাদা পালক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আসলে নতুন কিছু ঘটছে না। চেনা ছবিগুলোই অচেনা দৃশ্যে জুড়ে গিয়ে একরকম ধন্দ হয়ে উঠছে। নাম দেওয়া যাচ্ছে না। থতোমতো লাগছে। গা গুলিয়ে ওঠার আগে এরকম হামেশাই হয়। হলেই বা কী! যাই হোক, কলকাতায় তখন গাড়ির ধোঁয়া ছিল কম। উনুনের ধোঁয়াই বেশি। যদিও আমাদের বাড়িগুলোতে লাইন গ্যাস বা ইলেকট্রিক কুকিং রেঞ্জ ছিল।
এরকমই এক ধোঁয়াটে শীতের সন্ধেবেলায় আমরা সুমিতেশদের বাড়িতে ব্যাডমিন্টন খেলতে গিয়েছিলাম। সেদিন খেলা শুরু হয়েছে, এমন সময় দোতলার বারান্দা থেকে কেউ শেয়ালের ডাকের মতো শব্দ করে হেসে উঠল। তখন রাজু আর সুমিতেশ একদিকে, অন্য দিকে আমি ও মোহন। হাসির শব্দে চমকে আমাদের খেলায় কিছুটা ভয় ও কিছুটা অন্যমনস্কতা ঢুকে গেল। সার্ভিস করার সময় কোর্ট পাল্টাবার নিয়ম গুলিয়ে গেল। অন্য সন্ধের চেয়ে বেশি ঘামছিলাম আমরা। সেটা যে ওয়েদারের কারণে তখন আমরা তা বুঝিনি। সেই শীতের সন্ধেবেলাতেই অসময়ের গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হল। আমরা র্যাকেট, শাটলকক, শাটলককের সিলিন্ডারের মতো বাক্স- এইসব নিয়ে হুড়মুড় করে একতলায়, সুমিতেশদের বৈঠকখানায় চলে এলাম। নেট আর আলো ভিজতে থাকল। একটু-আধটু বাতাসের ঝাপটাও ছিল। সেই ঘরটায় ঢুকে আমরা রেক্সিন লাগানো বড় বড় চেয়ারে বসলাম। আমাদের জন্য স্লাইস করে কাটা প্লাম-কেক আর গেলাসে গরম ওভালটিন এল। খেতে খেতে আমরা গল্প করছিলাম।
-এই সুমিতেশ, ওপর থেকে ওরকম করে হাসছিল কে রে?
-ভূত!
-সত্যি বল না কে?
-আরে ও তো মল্লিকাকা! পাগল তো। ওরকম হেসে ওঠে।
-আমি তো ভাবলাম আমাদের খেলা দেখে হাসছে।
-খেলা যখন হয় না তখনও হাসে।
-হয়তো কোনও মজার গল্প বা লরেল-হার্ডি মনে পড়ে যায়।
-সে জানি না। তবে জানিস তো- একটা মেয়ে মল্লিকাকাকে পাগল করে দিয়েছিল।
-তুই কী করে জানলি?
-আমি যেরকম করে জেনেছি তোরাও সেরকম করে জানতে পারবি। সবটা মুভিতে তোলা আছে। যদিও কথা নেই কিন্তু। দেখবি?
-দেখব। কিন্তু কেউ যদি এসে পড়ে।
-আসুক গে। আমি তো কতসময় দেখি। তবে আগে তোদের একটা কথা বলে নিই। এই মেয়েটাকে ভালবাসার আগে মল্লিকাকা কেবল পাখি নিয়েই থাকত।
-কী পাখি?
-নানা জাতের পাখি। ছাদে পাখিদের জন্য জাল-ঢাকা ঘর ছিল। পায়রার খোপও ছিল। এ ছাড়া বারান্দায় বারান্দায় ছিল খাঁচা। কাকাতুয়া, ম্যাকাও, লাভ-বার্ড, নেপালি টিয়া, বদ্রিকা- সে কত রকম পাখি। ওই মেয়েটা মল্লিকাকাকে শিখিয়েছিল যে সবগুলো পাখি ছেড়ে দিলে তবেই ও মল্লিকাকাকে বিয়ে করবে। মাত্র চারটে বদ্রিকা তখন বাকি। তিনটে হলদে আর একটা নীল। ফিল্মে কিন্তু বুঝতে পারবি না। সব ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট। আর বার বার ওদের লিপ রিড করে কথাগুলো আমি বলে দিতে পারি। সবটা মিলিয়ে তোরা ঠিক বুঝে যাবি।
ঘরের কোণে কাপড় ঢাকা একটা প্রোজেক্টার ছিল। তাতে একটা ফিল্ম ভরা আর একটা ফাঁকা রিল লাগানো হল। হরিণের শিং লাগানো সাদা দেওয়ালের ওপর ফাঁকা একটা চৌকো জায়গায় আলো পড়ল। ওটাই সিনেমার পর্দা। প্রোজেক্টারের রশ্মিতে ধুলো ও পোকা দেখা যাচ্ছিল। ফট ফট করে গোড়ায় কিছুটা শব্দ হল। তারপর ওয়ান, টু, থ্রি লেখা পড়ল। প্রথম দিকটায় কাঁপলেও একটু পরেই দেখা গেল,
একটি খাঁচা। খাঁচার মধ্যে বদ্রিকা পাখিগুলো ঝগড়া করছে।
সুমিতেশ
মুখে পাখিদের ঝগড়ার শব্দটা করে। এরপর খাঁচার তলায় দেখা যায় একটা বাটিতে দানার মতো খাবার ও জলের বাটি। খাঁচাটা দূরে চলে যেতে থাকে ও শর্টস এবং স্যান্ডোগেঞ্জি পরা একটা লোককে দেখা যায় বার বার মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে পায়চারি করছে। সুমিতেশ বলল,
-মল্লিকাকা। মেয়েটা আসবে বলে ছটফট করছে। খাঁচার ওই চারটে পাখিই বাকি। বাকি সব ছাড়া হয়ে গেছে।
মল্লিকাকা বেশ কাছে। চ্যাপটা টার্কিশ সিগারেট ধরাচ্ছে লাইটার জ্বেলে। ধোঁয়া ছাড়ল। লাইটার পকেটে রাখল। খাঁচা। দুটো পাখি চুমু খাচ্ছে। দুটো পাখি ঝগড়া করছে।
সুমিতেশ দুরকম শব্দই করে।
ছাদে ওঠার সিঁড়ির মুখে মেয়েটিকে দেখা যায়। সে থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট, বড় বোতাম লাগানো হাত-ফোলা শার্ট ও সানগ্লাস পরা। একই পোশাকে একসময় সায়রা বানু, আশা পারেখ, সাধনা ও অন্যান্য হিরোইনদের দেখা যেত। বিশেষত ফিল্মের প্রথম দিকে। এরপরে ডায়লগ যা আসবে সবই সুমিতেশের গলায়।
-মল্লি! ম...ল্লি...!
-নো ডিয়ার, মল্লিনাথ সানিয়াল।
মল্লিকাকাকে দেব আনন্দের মতোই বা মিনিয়েচার গ্রেগরি পেক বলে মনে হয়।
মেয়েটির মুখ। ঠোঁট নড়ে। সুমিতেশের গলায় কথা একটু পরে আসে। মেলে না তবে চলে যায়।
-এখনও এই বার্ডগুলোকে তুমি ছাড়োনি? আমি তো জানতাম ওরা এখন জঙ্গলের দিকে উড়ে চলেছে।
-দ্যাখো, এরা জঙ্গলের পাখি নয়। কখনও হয়তো ছিল। কিন্তু জেনারেশনের পর জেনারেশন খাঁচাতেই ব্রিড করা।
-ওঃ মল্লি! সেই এক আর্গুমেন্ট। একটাও নতুন কথা নয়। মল্লি ওদের ছেড়ে দাও। রিলিজ দেম প্লিজ। ওদের আমি ক্যাপটিভিটিতে দেখতে পারি না। চাই না। কতবার বলেছি তোমাকে।
-শেষ চারটে লিটল বদ্রিকা যদি থেকে যায় তাতে ক্ষতি কী? তিনটে হলুদ, একটা নীল।
-তা হলে তুমি আমাকে চাও না?
-চাই। তোমাকে তো চাই-ই কিন্তু এই শেষ চারটে পাখিও চাই।
-তা হয় না। হয় পাখি, নয় আমি। একটা তোমাকে বেছে নিতে হবে মল্লি।
এরপরই দেখা যায় সূর্য ডুবছে। সুমিতেশদের বাড়ির চারপাশে বড় বড় গাছে ছায়া ঘনাচ্ছে। মল্লির মুখ। ডুবন্ত সূর্যের দিকে সিল্যুয়েট।
-বেছে নিলাম, তবে তাই বেছে নিলাম।
-কী বেছে নিলে মল্লি? পাখি না আমি?
-তুমি।
মল্লিনাথ খাঁচার দরজা খোলে। মেয়েটির মুখ দেখা যায়। হাসির বাঁধ ভাঙছে। ফের খাঁচা। সুমিতেশ দুপাশে হাত নেড়ে ও মুখে আলোড়ন ও ঝটপট-এর আবহ তৈরি করে।
পাখিগুলো খাঁচা থেকে বেরোতে ভয় পায়। মল্লিনাথ তাদের এক এক করে ধরে বাইরে আনে ও ছেড়ে দেয়।
মেয়েটি এক একটি পাখি ছাড়ার সঙ্গে হাততালি দিয়ে নাচে। মল্লিনাথের ঠোঁটে টার্কিশ সিগারেট ভেঙে ঝুলছে। চারটে পাখিই পাখসাট মারে কিন্তু ওড়ার অভিজ্ঞতার অভাবে জড়াজড়ি করে পালক উড়িয়ে নিচের দিকে পড়ে।
খালি খাঁচা। মল্লিনাথের মুখ। কিছু একটা বলছে কিন্তু সুমিতেশ সেটা বলে না। অতএব আমাদের কাছেও সেই ডায়লগ না বোঝা থেকে যায়।
পাখিগুলো নিচে ঘাসে ও ঝোপের মধ্যে পড়তেই এমন কিছু পাখি বা পাখিজাতীয় কুৎসিত প্রাণী সহসা বেরিয়ে আসে যেন তারা বদ্রিকাগুলোর জন্য আলো-আঁধারিতে অপেক্ষা করছিল। তাদের কারও গায়ে লোম। পালক নেই। কাউকে দেখতে উড়ন্ত গিরগিটির মতো। কারও ঠোঁটের ফাঁকে করাতের মতো দাঁত রয়েছে। তারা চারটে বদ্রিকাকে ছিন্নভিন্ন করে, রক্ত খায়, মাংস খায়, ছিঁড়ে কুটি কুটি করে।
ফের ফাঁকা খাঁচা। পাশেই মল্লিনাথের মুখ। চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। নিচে নামার সিঁড়ির দিকে মেয়েটি এগিয়ে চলেছে। ফের মল্লিনাথের শুধু দুটো চোখ। সুমিতেশ বলল,
-এই, এই সময় থেকেই মল্লিকাকা পাগল হয়ে গেল। ফিল্মও শেষ।
-কিন্তু চারটে পাখিকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেল ওরা কারা? ওরাও কি পাখি?
-পাখি আবার ঠিক পাখিও নয়। সবই পাখিদের প্রাগৈতিহাসিক চেহারা। এমন পাখি এখন আর নেই।
-নামগুলো জানা যায় না?
-কেন যাবে না? আরকিওপটেরিক্স, অ্যাপোটরনিস, প্যালিওকারসনিস, হেসপেররনিস, সিনোসরোপটেরিক্স প্রাইমা, টেরোড্যাকটিল।
-টেরোড্যাকটিল বাদে অন্য একটারএ নাম আমরা শুনিনি।
আমাদের জন্য আবার এল কেক ও কোকো মেশানো গরম দুধ। আমরা খেতে লাগলাম। সকলেরই গা একটু আধটু গুলোচ্ছিল।
পরে, আমরা যখন বড় হলাম তখন সকলেই আরও মোটা হলাম। তবে তখন আর দুধ নয়, মদ খেতাম আমরা। গা গুলোনোটা কিন্তু থেকেই গেল।
সুমিতেশ পরে ওই ফিল্মটি ডিজিটালি রেসটোর্ড করায় এবং ছবিটির সাউন্ডট্র্যাক স্টিরিও সারাউন্ড সাউন্ড দিয়ে তৈরি করা হয়। প্রথমে ভিডিও ক্যাসেট হয়। পরে ভিউ সিডি।
ছবিটা প্রায়ই দেখানো হয়। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। স্টার মুভিজ, টি সি এম, এইচ বি ও, জি এম জি এম ইত্যাদি চ্যানেলে। ছবিটা দেখার সময় আমাদের মল্লিকাকার হাসিটা মনে পড়ে যায়। ভয়ও করে।
কিন্তু কাউকে আমরা বুঝতে দিই না।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন