শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৪

আকাশে / সৌমিত্র সেনগুপ্ত


এই ঘরে এই একটাই জানলা। আমার আকাশ। এখান থেকে আকাশের ঠিক যতটুকু দেখা যায় ততটাই আমার চৌহদ্দি। এখান থেকে চোখ ঠিক যতটুকু নিয়ে যায় ততটাই আমার পৃথিবী। তার বাইরের জগৎটা আমার অদেখা। আমি জানি সেখানে অভেদ্য অন্ধকার। এটা আমি জেনেছি আমার অনুভূতিতে। এটা অন্য পৃথিবী। আমার একার। এখানে সবটাই অব্যক্ত, নিয়মের বাইরে। এখানে আমি নিয়মহীন, উচ্ছৃঙ্খল, ছন্দহীন, অবাধ্য।  

এতদূর এসে একটা কনফেশন ডিউ হয়। ওই পৃথিবীটা আমার একার হলেও এই ঘরে আমার একটি দোসর আছে। সৌমিত্র সেনগুপ্ত। ইন ফ্যাক্ট, এই ফ্ল্যাটটা সৌমিত্রর’ই। ওর একাকীত্ব কাটাতে আমাকে নিয়ে এসেছে এখানে। ও বাড়িতে থাকে না খুব একটা। সারাক্ষণ শুধু অফিস। ওই প্রথম কঙ্কনা’কে এখানে নিয়ে আসে আমাকে সঙ্গ দিতে। কঙ্কনা স্মার্ট, কথাবার্তায় সুন্দর ও রূপসী। অথচ অদ্ভুত বিষণ্ণ। ও কবিতা লেখে। ওদের দু’জনের কেউ স্বীকার না করলেও আমি জানি ওরা পরস্পরকে ভালোবাসে।  কঙ্কনা যে আমার কাছে আসে তা শুধুই সৌমিত্র বলেছে বলে। নইলে আমার ব্যাপারে ওর কোনও ইন্টারেস্ট নেই। কিন্তু অদ্ভুত দক্ষতায় এটা ঢেকে রাখে কঙ্কনা। অন্য যে কেউ ভাববে আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা।

ফ্ল্যাটটা ভাগাভাগির হলেও এই জানলাটা আমার একার।  এখানেই সেই মেয়েটির সাথে আমার পরিচয়, তারপর ও আগামী। অনেকগুলো বাড়ি পেরিয়ে একটি জানলায় থাকে মেয়েটি। আমার জানলা থেকে ওর জানলা আনুমানিক সাত দিনের পথ। বাতাস আমাদের এই দূরত্বকে কমিয়ে আনে। এমনকী আমাদের কথাবার্তাও সেই বাতাসেরই ভরসায়। আমার জানলা আর ওর জানলার মাঝে ছড়িয়ে আছে আমাদের বৈকালিক। সে আমার প্রেমিকা নয়। এমন নজরকাড়া চেহারা আমি আর দেখিনি। ও সকালে বাড়িতে থাকে না। সকালের দিকে ওকে কোনওদিন জানলায় দেখিনি আমি। ও আমার বিকেলের সাথি। বিকেলবেলায় যখন আমি আমার আকাশে উড়ে যাই ও জানলায় দাঁড়িয়ে আমার উড়ান মাপে। হয়তো লক্ষ্য করে কখনও আমি ওর সীমানায় ঢুকে পড়ি কিনা। এই ব্যাপারে আমি নিজেও খুব সিওর নই।  কারণ ওড়ার সময় আমি কোনও নিয়ম মানি না। অবশ্য কখনও কোনও প্রতিবাদ করেনি ও। যেন গোটা আকাশটাই আমাদের দুজনের। এভাবে আমাদের প্রতিদিনের বিকেল ও বাতাসের শেয়ার।

শুধু আকাশ কেন, আমাদের শেয়ারে রয়েছে অজস্র কথোপকথন। যেমন আমি জানি ওর অনেকটা সময় কাটে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে বসে। ও বলে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে কিছুটা সময় তাকিয়ে থাকলে নাকি ও নিজের ছায়াকে খুঁজে পায় ও তার সাথে কথা বলে। এটা বেশ ভালো লেগেছে আমার। ও যেন স্বয়ংসম্পূর্ণা। কোনও কঙ্কনার প্রয়োজন নেই ওর। কথাটা ওকে বলাতে একটু হেসে বলেছিল– তা কেন হবে, তোমাকেও তো আমার চাই আকাশের শেয়ারে।

*******

-   সারাটা দিন কী করিস বলতো?
-   কিছুই করি না।
-   তোর সময় কাটে কী করে? কঙ্কনা আসে?
-   মাঝে মাঝে।
-   আর বাকি সময়টা?
-   একাই।
-   পাগল হয়ে যাবি তো ...
-   এই মুহূর্তে আমি যে পাগল নই একথা কি কেউ বলেছে তোকে?
-   হ্যাঁ বলেছে, আমার অনুভূতি।
-   ওটা কঙ্কনাকে দিয়ে দিস। ওর কাজে লাগবে।
-   ওর কোনও অনুভূতি নেই বলছিস?
-   সেরকম কিছু বলিনি তো!!! বলেছি তোর অনুভূতিটুকু পেলে ও হয়তো চোখের দেখার বাইরে যে অন্ধকার সেখান থেকে কিছু কথা কুড়িয়ে নিতে পারবে।
-   তোর কথা বুঝতে আমার আর একটা জন্ম লাগবে।
-   তাই তো বললাম তোর অনুভূতিটুকু এবার কঙ্কনাকে দিয়ে দে।

এটা গতরাতের ডাইনিং টেবিলে আমার ও সৌমিত্রর কথোপকথনের টুকরো। কঙ্কনার অসংখ্য কবিতা আমি পড়েছি। অনেকদিন ও নিজেও কিছু কিছু কবিতা শুনিয়েছে আমাকে। কেন জানি না আমার মনে হয় ওর অনুভূতি এখনও সেখানে পৌছায়নি যেখান থেকে চেতনা পথ দেখায়। ওর কবিতা তাই বড় স্থূল মনে হয় আমার। যে কথাটা বহুবার ওকে বলতে চেয়েছি আমি তা হল যুক্তিকে অগ্রাহ্য করেই কবিতা আসে। এখান থেকে চেতনাই পথ দেখায়। যুক্তির টানাপোড়েনে কবিতা হারিয়ে যায়। ও বুঝতে চায় না।  তাই আজকাল কবিতা শুনে শুধু ‘ভালো লেগেছে’ বলে ছেড়ে দিই। বিশদে যেতে মন চায় না।

আজ বিকেলে যখন আমি আকাশে দেখলাম জানলা ছেড়ে বেরিয়ে এল ও। একটু যেন হাসল আমাকে দেখে। এরপর কিছুটা একসাথে ওড়া আর কথা–

-   তোমার বন্ধুকে দেখলাম আজ।
-   নারী না পুরুষ?
-   নারী। ওর নাম কঙ্কনা, তাই না?
-   হ্যাঁ। কিন্তু তুমি ওর নাম জানলে কী করে?
-   অসংখ্যবার ওকে ওই নামে ডাকতে শুনেছি তোমায়।
-   কখন?
-   যখন জানলায় দাঁড়িয়ে কথা বলো তোমরা।
-   ওকে ভালোবাসো তুমি?
-   ঠিক জানি না। ও আমার প্রেমিকা নয়।
-   বন্ধু?
-   হয়তো।
-   তোমার অনুভূতিগুলো ওকে স্পষ্ট করে জানাও না কেন?
-   অনুভূতিকে শুধুমাত্র অনুভবেই পাওয়া যায়। ভাষায় প্রকাশিত অনুভূতি বড়জোর তার একটা রাফ স্কেচ হতে পারে। অনুভূতির কাছাকাছি পৌঁছানোর একটা গাইড ম্যাপ।
-   এখানে হৃদয়ের কোন ভূমিকা নেই?
-   না নেই। ভূমিকা শুধু চেতনার।
-   প্রেম তবে কী?
-   চেতনাজাত চেতনার অনুরণন।
-   তোমার জীবন কি প্রেমহীন?
-   হয়তো।

কথা না বাড়িয়ে নিজের জানলার দিকে উড়ে গেল ও। একটা অদ্ভুত বিষণ্ণতার ছাপ  কি ছিল ওর চেহারায়? কয়েক ফোঁটা জল ডানা ভেজালো আমার। বৃষ্টি…। নিজের জানলার দিকে ফিরলাম আমি।  

*******

কতক্ষণ ধরে বৃষ্টি দেখছি জানি না। চমক ভাঙল পিঠের ওপর মেয়েলী হাতের স্পর্শে। পিছনে কঙ্কনা। আজ হালকা আলো ওর চোখে। এই আলো আমি চিনি। চেতনার উদ্ভাস। একটু হাসল কঙ্কনা। নামানো স্বরে বলল– বৃষ্টি দেখছ? ভিজতে ভাল লাগে তোমার?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন