শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৪

ভালোলাগা বই : রজকিনির হাঁস / তপন রায়


ব্রত

দারিদ্র ছিল না যেন উপবাসব্রত ছিল কাল

বঙ্গোপসাগর থেকে আমি যতদূর
ততোটা দূরত্বে থাকে বঙ্গোপসাগর
মনুর বংশের আমি কেউ নই
মানব হিসেবে নই নৌকো বা নাবিক
সমুদ্রের প্রতি শুধু কৌতুকবশত
কাগজের নৌকোগুলো ভাসিয়ে দিয়েছি সব
কবে কোন এলোমেলো বাদলের দিনে

প্রতিভা ছিল না জানি অভিমানব্রত ছিল কাল
আমার আঙুল তুমি কেটে নিয়ে চলে গেছ কবে
হে আচার্য, আমারই আঙুল কাল পড়ে ছিল দিগন্তের ধারে



রজকিনি ২

পুরুষেরও ঋতু আছে; স্নান, দুর্ঘটনা আছে;
বসন্তে, হে মান্য, তাই অনন্তর অপচয় ছিল
ধোপানি নিয়েছে কেড়ে আমাদের শীতবস্ত্রগুলি
দিয়েছে ভঙ্গুর একী লীলাময় সাবান দিয়েছে।



তাঁবু

তাহলে ফাল্গুনেই কন্সট্রাকশনের তাঁবু পড়েছে এবছর।

রজকিনি ফিরবে না জানি
টুলস্-হাতে কামিন রমণী, তুমি এলে।
নিতম্বে চাপড় মেরে ভাবোনি কি
'আসুক তাহলে আজ মদমাদলের শেষে একফালি বিনোদ...'

অথচ শীতেই ছিল ঝাউবনে আমাদের ধ্যান
ভিতরের দন্তন্যগুলো ভারি ইনোসেন্ট মনে হয়েছিল
সেবার আমারো ছিল মদ্যপান বিষয়ে শাস্ত্রবিরোধী ভয়
এবং মানিলার নিজেরই দাঁতে-কাটা নখের নন্দন
বিশেষ, মানিলা থাকে দূরের শহরে। সর্দিগর্মি বিষয়ে
সতর্ক করেছে কতবার। পাঠিয়েছে মায়াময় মাফলার।

এখন ফাল্গুন জুড়ে মনে হয় কোনওদিকে দৃশ্যত তাকানো যাবে না।
কিংবা যে কোনও দিকেই আমি চলে যেতে পারি যে কোনও ফাগুনে
কেননা তারও আছে লেবার-ইউনিয়ন, পলাশ রঙের ঢিলেঢালা
অথচ প্রহরাধীন তীব্র বুকজামা।

সকল ফাল্গুন তাঁবু। তাঁবুর ওপারে কারা পাতলুনপরা মৃদুহাইফেন
গুঁজে দিয়ে গেলে তুমি ভাবো চাঁদ। ভাবোনি নতুন ধাঁধা।
হোমগার্ড ভাবোনি। শংসা ও পলাশের প্রথম বৃষ্টিগুলো ফিরে পেয়ে
প্রথমত গোল, তর্কাতীত, ক্রমে অতিকায় সবুজ লজেন্স তুমি...আহ্...
                      আমি আর তাকাতে পারিনি...


অনন্ত

অনন্ত মিত্রকে আর অনন্ত মিত্র ভাবা ঠিক নয়
অনন্ত বাবুকে দেখে লাহাদের মুখ মনে পড়ে
লাহাদের মুখগুলি চৌখুপি গোঁফদাড়িহীন
তথাপি লাহাকে আর বর্গক্ষেত্র ভাবা ঠিক নয়
লাহাদের মেজোছেলে তবলা বাজাতো ভালো
আমরা ভেবেছি তাকে মোটামুটি তেরেকেটে তাক
সেবার বসন্তকালে লাহাদের বাবা মারা গেলো
এবার লাহাকে আর মাকুন্দ ফাকুন্দ বলা ঠিক নয়
অনন্ত মিত্রকে আর অনন্ত মিত্র ভাবা অনুচিত
অনন্ত আমাকে দেখে বারবেলা মুচকি হেসেছে অতএব
মিত্রকে আড়ালে আর শম্ভু মিত্র ডাকা ঠিক নয়
উচিত হবে না আর মিস জুলেখার চিঠি চুরি করা
বিশেষত জুলেখার বয়স অধিক হলো বর জোটে নাই
লোকের পেছনে লাগা ঠিক নয় এমনকী রবীন্দ্রনাথের




অনন্ত ৪

তোমার অভাব হেতু আমি অন্ধকার
নিশীথের মশারির পেটের ভিতর
ব্যর্থ যকৃতের মতো ফুলে ঢোল হয়ে আছি
কিছুই লাগে না ভালো হে আরোগ্য হে নিরাময়
তোমার অভাব হেতু এসব সমুদ্রতীর
আমাকে দিলনা ধ্যান দিল ঢেউ দিল রাতের হোটেল
যেখানে বন্ধ ঘরে অরন্তুদ সাপ লুডো খেলা
অথবা সঙ্গম কালে আমাকে পাণ্ডু ভেবে ছেড়ে যাবে নারী
তোমার অভাব হেতু আমি অন্ধকার
মালাবার পাহাড়ের পেটের ভিতর
না কোনও ওঁকার শুনি না কোনও ধিক্কার
কিছুই লাগে না ভালো হে আরোগ্য হে নিরাময়
আমাকে দিয়েছ দূর স্যানাটোরিয়াম আর নিমট্যুরিজম
দু'হাতে দিয়েছ কত টিভি সিরিয়াল দু'পায়ে ভেলোর


শেষ লেখা

রজকিনির হাঁস তার শেষ লেখার কোলে ফিরে যেতে চায়
যেভাবে জামার তুলো ফিরে পেতে চায় বীজের নির্জন

উদাসি ময়লা জামা রজকিনি কেড়ে নিয়েছিল
ফাৎনা আর শীত বস্ত্রগুলি
মলিন ডাইরি থেকে অশ্রুমোচনের পাতা সন্তর্পণে নিয়েছিল খুলে

কাপড় কাচার ফাঁকে কাঁচাকাপড়ের পাকা গল্পে ভরে গিয়েছিল ফাঁকা রবিবার
যেভাবে পুরনো ঘড়ি ভরে ওঠে নতুন বালিতে

কাচা হয়ে গেলে অমন কাঞ্চনজঙ্ঘা তুমি মেলে দিয়েছিলে রোদে
হঠাৎ হাঁসের বেশে উড়ে গিয়ে মিশে গেলে মেঘে

        'যাক,' সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিল রজকিনি, 'জানতাম যাবে।
        কাপড় কাচার আগে আমিই তো ওকে মেরে রেখেছিলাম।'
        এই ভেজা-কাঞ্চনজঙ্ঘা, এই হাঁস তার কে হয়
        এসব প্রশ্নে রজকিনি নীরব থেকেছিল
        একা প্রযোজক শুধু ফিরে যায় ফাঁকা করিডোরে

রজকিনির হাঁস তার শেষ লেখাটা পেতে চাইছে এখন
যেভাবে ঝড়ের পাখি মুখ গোঁজে বালির বিবরে

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন