শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৪

এই সংখ্যার কবি : কৃষ্ণ মণ্ডল

বিচ্ছেদ

১

আমি একটা কাকের কথা ভাবছি
খাবার মুখে কাক তার বাচ্চার দিকে উড়ছে
খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ছে বাচ্চারা...

গ্রীষ্মের দুপুরে মোটে দু-চার ফোঁটা বৃষ্টি হচ্ছে
কারওর সঙ্গে কারওর দেখা নেই আজও


২

একটা মানুষের কষ্টের কথা ভাবতে ভাবতে
আরেকটি মানুষের ঘুম চলে আসছে
বিশাল এই ব্রহ্মাণ্ডর মহাদুঃখের মাঝে
আমাকে খুব ছোট দেখাচ্ছে
খুব ছোট দেখাচ্ছে তোমাকে

দূরবীনে দেখা ভালোবাসার দিন পেরিয়ে
তোমার কাছে বসে আছি
তবু তুমি অন্ধকারেরই মাথায়
হাত বুলিয়ে দিচ্ছ!


৩

আকাশের দিকে তাকাতে বুকে দম লাগে

বাতাসের কথা শুনতে বুকে দম লাগে আজকাল

অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতার ভিতর
পাখিরা মিলিয়ে যাচ্ছে
ওদের খুঁজে বের করতে হবে

আমাকে ভালোবাসতে বাসতে
তোমার দম ফুরিয়ে যাচ্ছে...

তোমাকে বাঁচতে হবে



জলস্থল

শিকড় ছিঁড়ে গেছে তবুও
দু-তিনটে কুঁদরি
ঝুলে আছে ইলেক্ট্রিক তারে

গতরাতের তুমি উপড়ে ফেলেছ তোমাকে
তবুও তোমার ভালোবাসা
ভেসে আছে শূন্যে
ভালোবাসায় আজ
ঘুরঘুর করছে পিঁপড়ে

গাজায় বোমাক্রান্ত শিশুর মতো
যারা কেঁদেছিল
তারা শুকিয়ে গেছে
তাদের গান আজ উড়ছে শূন্যে

নীচে মানুষ মানুষের কাছাকাছি এসে
পোশাকে পরিচ্ছদে
মোমবাতির আলোয়

      দুঃখ দেখাচ্ছে



লা লা লা না না না

গান গাইতে গাইতে
একটি গানের অন্তরা হয়ে যাচ্ছিলাম আমি
গান গাইতে গাইতেই
ভেসে গেল আমার এই বডি
‘বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও’ বলে আঁকড়ে ধরলাম মণীষাকে
মণীষার দেহ ভেসে গেল সুরে
ধূপের গন্ধ ভেসে এল
হরিবোল বলহরির ধোঁয়ায়
হারিয়ে গেল গান

আমি আমার চেহারা
        মায়ের মুখ
মনে করতে পারলাম না কিছুতেই



অপেক্ষা

গাছের সঙ্গে গাছের কোনও বিশ্বাসঘাতকতা নেই
                   শ্রেণীশত্রুতা নেই
তালগাছের গায়ে শিকড় ছড়িয়ে দিয়েছে বট

ওহে তালগাছ, শরীরে ভালোবাসা
শরীরে শুকিয়ে-আসার দাগ নিয়ে
তুমি যে মরে যাবে!

তবু আকাশমুখী তুমি
      উচ্চাকাঙ্ক্ষী
মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রইলে
পুকুরপাড়ের সেরা গাছ হয়ে
বজ্রপাতের অপেক্ষায়?



শব্দের ভিতর বাহিরে

আমারও জীবন ছিল

নুন কৌটোর চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে একদিন
মনোবিদের টেবিলে থেমে গেলাম।

তালপাতার পাখার হাওয়ায় কিছুটা শান্ত হয়ে
উনুনের দিকে তাকিয়ে ফেললাম আবার
কাঠের ভিতর দিয়ে
সংসারের আগুন ছুটে আসছে
এর বাড়ি তার বাড়ি
জীবনানন্দ বিনয়ে গিয়ে মাথা গুঁজলাম
কিছুটা শান্ত হলে
অন্ধকার মশারির গায়ে হাত লেগে যায়
দিপদিপ জ্বলে নেভে মৃত্যু
ময়লা ঝাঁটার ভেতরে
পিঁপড়ে পেরোনোর শব্দ শোনা যায়

শব্দের গভীরে আরও ক্ষীণ শব্দ
তারও গভীরে আরও...
কে যেন ডাকছে আমায়

এই, তুমি নয় তো?

৩টি মন্তব্য:

  1. অসম্ভব ভাল লেগেছে।ভাবনার সুন্দর স্ফুরণ--

    উত্তরমুছুন
  2. যে-কজন তরুণ কবির লেখা ইদানীং পড়ে ভালো লাগে, মনে হয় অকারণ ভান ও ভণিতা থেকে মুক্ত, কৃষ্ণ মণ্ডল তাঁদের একজন। তাঁর ৫টি কবিতা একত্রে পড়তে পেয়ে যারপরনাই আনন্দ পেলাম। চমৎকার লেখা।

    উত্তরমুছুন
  3. অনন্যসাধারণ লেখা । শুভেচ্ছা.....

    উত্তরমুছুন